অ-রাজনৈতিকবোধ, মূল্যবোধহীনতা ও দুর্নীতি: এই প্রজন্ম
অহিন্দ্রী ব্যানার্জী
মূল্যবোধের ঘাটতি এই স্কুল-কলেজ পড়ুয়া থেকে একট বড় অংশের যুবসমাজের মধ্যে এক ক্ষয় যা সামাজিক ঘটনাবলির আরও অবনতিকে চরমভাবে ত্বরান্বিত করছে।
নৈতিকতা বা মূল্যবোধের ঘাটতি এই প্রজন্মকে দিচ্ছে আপোষ করে চলার এক অসীম ধৈর্য্য যা একটা সময় পর তার ঠিক ভুল বিচার করার ক্ষমতা বিলীন করার সাথেই একদিন তাকে নৈতিক শিক্ষা বিনাশকারীতে উত্তরণ ঘটাবে।
এবং এর অন্যতম কারণ হচ্ছে রাজনৈতিক অসেচতনতা। এই রাজনৈতিক অসেচতনতা তো শুধুমাত্র কোন দল ভোটে লড়ে তা না জানার ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয় না, রাজনীতির পরিসর আরও বড়। সমাজের কোনো ঘটনাই বিচ্ছিন্ন নয়, ঘটে একটা সূত্র ধরে। আর সেই সূত্র সেই সময়কার রাজনীতির অংশ।
আমি যখন স্কুলে পড়তাম, ৯-১০ বা তার পরেও, আমার সমবয়সীদের মধ্যে চারিপাশে ঘটে যাওয়া সামাজিক বিষয় গুলো নিয়ে কোনো আগ্রহ দেখতাম না। তবে কোনো সিনেমা কে করল, কে কোন কাপ পেল ক্রিকেটে তা তারা খবর রাখত। মেয়েদের ক্ষেত্রে আরও একটা বিশেষ জিনিস ছিল সাজগোজের সরঞ্জাম নিয়ে আপডেটেড থাকা। তা ভালো, আমি তখন মনে করতাম যে সকলের সব বিষয়ে এত তাড়াতাড়ি মাথা ঘামানোও বাধ্যতামূলক নয়। কিন্তু কলেজে উঠেও যখন দেখি সেই গোষ্ঠীর একটা অংশ অরাজনৈতিক এবং অন্য অংশ "সব দল এক" অরাজনৈতিক বা রাজনৈতিক হয়ে পড়েছে তখন থেকেই আমার এই ধারণা জন্মায় যে মূল্যবোধ না থাকার একটা কারণ হয়ত রাজনীতি সম্পর্কে অসেচতনতা।
ছোটোবেলায় পড়ানো হয় মানুষ একটি সামাজিক প্রাণী, আর কিছু নীতিকথার গল্পও আমাদের ছোটোবেলায় পড়ানো হয় দু-পেয়ে জন্তু থেকে মানসিকভাবে মানুষ তৈরি করতে, আমাদের মধ্যে নৈতিক চেতনা এবং মূল্যবোধ তৈরি করতে। আবার এই সমাজ সম্পর্কে সচেতনতাই রাজনৈতিক সচেতনতার জন্ম দেয় (রাজনীতির নয় কিন্তু, সেটা আগে থেকেই উপস্থিত)। আর যারা সমাজকেই দেখতে বা চিনতে চায় না তাদের ক্ষেত্রে সমাজে ঘটে যাওয়া যেকোনো অনভিপ্রেত ঘটনাই তাদের ভাবনায় ঘন্টা নাড়ে না। সেইজন্যই কাউকে হিজরে, gay, ইত্যাদি ইত্যাদি বলা এই প্রজন্মের কাছে খুব হাস্যরসের সূত্র।
এই মুহূর্তে রাজ্যের খবরে তাকালেই দেখব প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী এবং সদ্য প্রাক্তন হওয়া শিল্পমন্ত্রী কোটি কোটি টাকা নিয়ে ধরা পড়েছেন দুর্নীতির দায়ে। কীসের দুর্নীতি? না শিক্ষা বেচার দুর্নীতি, শিক্ষা কলুষিত করার দুর্নীতি। আর পাঁচটা দুর্নীতির মত নয়, যদিও আমরা জানি যেকোনো দুর্নীতিই অন্যায্য, ঘৃণ্য। কিন্তু সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে এই, যে দুর্নীতি বিষয়টা যে ঘৃণ্য তার বোধই হারিয়ে গেছে। দুর্নীতি শব্দটা সেভাবে নাড়া দিতে আর পারছে না, হয়ত এর থেকে ভারী কোনো শব্দ প্রয়োগ করলে বিষয়টাতে এই প্রজন্মের আকর্ষণ আনা যেতে পারে। আমার জানা নেই, সন্দেহ আছে।
সন্দেহ রয়েছে কারণ, যে ছাত্র-ছাত্রীরা নিজেরাই টাকা দিয়ে কলেজের সিট কিনছে, অন্য কোনো যোগ্য প্রার্থীর জায়গা টাকা দিয়ে দখল করছে এবং একটা দুর্নীতির চক্রকে অনুমোদন দিচ্ছে তারা কি আদৌ ঘুষ দিয়ে চাকরি পাওয়া বা দেওয়াটা-কে কোনো খারাপ কাজ বলে মনে করবে? তাদের মনে এই ঘটনার বিরূপ প্রতিক্রিয়া কি আদৌ তৈরি হবে? এখনও অবধি তাদের প্রতিক্রিয়ার অধিকাংশই ঘুষখোরটার তার বান্ধবীর সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে মিম।
কিছু কিছু অবশ্য ঘুষ খাওয়া নিয়েও রয়েছে। তবে ৫০০ দিনের ওপর যারা রাস্তায় বসে টানা আন্দোলন করে গেল, তাদের ওপর সরকারের অসভ্য আক্রমণ, খোদ মুখ্যমন্ত্রীর মিথ্যে প্রতিশ্রুতি এসব বিষয় কিন্তু তাদের দৃষ্টিগোচর করে গেছে অথবা খুব একটা "ইন্টারেস্টিং মেটেরিয়াল" বলে মনে হয়নি। শুধু এই একটা বিষয় নয় আমাদের মুখ্যমন্ত্রীর গত ১০ বছরের বক্তব্য শুনলেই বোঝা যায় উনি বিভিন্ন সময় হয় মিষ্টি ভাষায় হুমকি দিয়েছেন, কখনও "পাগলামির" সুরে দুর্নীতিতে ওনার অনুপ্রেরণা বুঝিয়েছেন এছাড়াও মিথ্যের ঝর্না ঝড়িয়েছেন। মুখ্যমন্ত্রীর পদে বসে নাগাড়ে মিথ্যে কথা বলে যাওয়াটা যে অপরাধ সেই বোধ তাদের নেই।
এর কারণ হিসাবে অবশ্য কন্যাশ্রীর ৫০০, সবুজ সাথী এমন কিছু ল্যামেনচুস রয়েছে। এখন যদি বাড়িতে বাবা-মায়েরাই সন্তানদের বোধগম্য হওয়ার আগে থেকে বোঝাতে থাকেন যে "দিদি তোকে ৫০০ টাকা দিয়েছে, আরও ২৫ হাজার টাকা দেবে" তাহলে তার মনে কি শুধু টাকার হিসেবই চলতে থাকবে না? ২০১৫ সাল, নারী নিরাপত্তাহীনতা নিয়ে সোচ্চার বাংলার চারিদিক। তখনও আমার ক্লাসমেটের মুখে শুনেছি "তাতে কী হবে, দিদি অনেক কাজ করেছে, রাস্তা করেছে আর আমাদের কন্যাশ্রীর টাকাও দিচ্ছে", আমি অবাক হয়েছিলাম। একটা শহরে থাকা মেয়ে বা ছেলের যার বাড়ি থেকে স্কুল হেঁটে ১০ মিনিট কিংবা দূরে স্কুলে যাওয়ার জন্য বড় রাস্তা রয়েছে যা দিয়ে নানা যান চলাচল করে, তার সবুজ সাথী সাইকেলের কি ততটা প্রয়োজনীয়তা রয়েছে যতটা গ্রামের সেই ছাত্র বা ছাত্রীর প্রয়োজন যার বাড়ির সামনে কাঁচা রাস্তা আর স্কুল যেতে হয়ত হেঁটে ৪০ মিনিট লাগে? সাইকেলের ব্যবস্থা আগের সরকারের আমলেও ছিল তবে যাদের সত্যিই প্রয়োজন তাদের জন্য, আসলে এসবের বিজ্ঞাপন দিয়ে তো ভোট চাইতে হয়নি বা অন্য কোনো গাফিলতি ঢাকতে হয়নি। কিন্তু সেসব প্রকল্প অনেকের অজানা, জানতে পারলেও একটি অত্যন্ত আত্মকেন্দ্রিক মন্তব্য অবজ্ঞার সুরে ভেসে আসবে "সে আমাদের তো দেয়নি। দিদি আমাদের দিয়েছে" মানে দিদি এবার হাজার এক অনৈতিক কর্মকান্ড করার লাইসেন্স পেয়ে গেল। যাক এ নিয়ে আলাদা একটা আলোচনা হতে পারে যে কোন প্রকল্পের কোন নাম থেকে কোন নামে পরিবর্তন ঘটেছে।
আমার বক্তব্য হচ্ছে এই আত্মকেন্দ্রিকতা-কে নিয়ে। মানুষ যে একটি সামাজিক জীব, এবং সমাজচিন্তা ছাড়া জাতিগতভাবে তার উত্তরণ সম্ভব নয় এই ভাবনা তো ভ্রূণেই নষ্ট করা হচ্ছে। নষ্ট করা হচ্ছে বিশ্লেষণী ক্ষমতা। এবং সেই কারণেই তারা একবার ২৫ হাজার টাকার আশায় এটাও বুঝতে পারছে না যে সরকারের কর্তব্য জনগণের দায়িত্ব নেওয়া, তাদের ভবিষ্যৎ সুনিশ্চিত করতে সরকারি চাকরির সুযোগ করে দেওয়া। সরকারের ভুলগুলোকে ভুল হিসাবে শনাক্তই না করতে পারলে, সরকারের করণীয় সঠিক কাজগুলিকে কীভাবে উপলব্ধি করবে? আর তা না হলে কর্দমাক্ত সমাজটা এগোবে কীভাবে?
সুতরাং অন্যায় সহ্য করার যে রীতি শৈশব থেকেই নতুন প্রজন্ম দেখতে দেখতে বড় হচ্ছে তা বাস্তবে ৫-১০ বছর নয় নষ্ট করবে ১০০ বছর কিংবা তারও বেশি সময়। এবং যা কিছু অন্যায্য তাকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন একটা মূল্যবোধহীন সমর্থক যারা হয় এতে অংশ নেবে আর নাহলে চুপ করে দেখে যাবে কিন্তু রা কাটবে না। এই প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে এবং বাঙালীরা বাঙালী হিসাবে যা কিছু নিয়ে গর্ব করে তার কতটুকু অবশিষ্ট আছে তা নিয়ে আমার সন্দেহ আছে। আর একটা উদাহরণ দিই। একজন লোক কোনো এক সিরিয়াল বা সিনেমায় অভিনয় করে জনপ্রিয় হয়েছেন, তিনি এমন একটি দলের হয়ে ভোটে দাঁড়ালেন যাদের অতীতে ধর্মীয় গণহত্যার রেকর্ড আছে, এবং বর্তমানে গণহত্যা না হলেও একক হত্যা করে থাকে। কিন্তু তাকে ভোট দেওয়ার জন্য এই প্রজন্মের একাংশ প্রস্তুত কারণ সে 'হ্যান্ডসম'। এখানেও মূল্যবোধের অবক্ষয় স্পষ্ট।
আগেই বলেছি শিক্ষায় দুর্নীতি আর পাঁচটা দুর্নীতির থেকে আলাদা, এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। একজন শিক্ষক সমাজের মেরুদন্ড তৈরি করার পথিকৃৎ। কিন্তু এই ধরুন, যে শিক্ষকরা মূল্যবোধ বিক্রি করে অনৈতিকভাবে শিক্ষকের চেয়ারটা কিনেছে সেই শিক্ষক কি কোনোদিন তার ছাত্রকে ওই নীতিকথার গল্পের সঠিক অধ্যয়ণ করাতে পারবে? এ কথাও কি বলতে পারবে যে অন্যায় যে করে, অন্যায় যে সহে উভয়েই দোষী? পারবে না। কারণ যখনই এই প্রবাদ গুলো প্রয়োগের সম্ভাবনা তৈরি হবে তখন এই শিক্ষকরাই মেরুদন্ড কীভাবে সামনের দিকে বাঁকিয়ে সোজা কথায় গা বাঁচিয়ে চলতে হয় তা শেখাবেন, তাদের সুবিধাবাদী হতে শেখাবেন। এভাবেই তারা মৌখিক অরাজনৈতিক হতে হতে চরিত্রগত দিক থেকে আপাদমস্তক ডানপন্থী হয়ে উঠবে। এখন শাসক একজন পরিচিত চোরকে তার দলের মুখপাত্র বানিয়ে নিজেদের সততার সাতকাহন সেই চোরেরই মুখ দিয়ে বলিয়ে চোর হওয়াটাকে সান্মানের জায়গায় পৌঁছতে চেয়েছে। আমরা না চাইলেও একজন চোরের কথা আমাদের শুনতে হচ্ছে। এখন বিষয় হচ্ছে আগামীকাল যদি এই লোক কোনো স্কুল বা কলেজে অতিথি হয়ে আসে তখন ক'জন শিক্ষক বা অধ্যাপক ছাত্রদের শেখাতে পারবেন যে ওই লোকটা একজন দুর্নীতিবাজ তাই তার সামনে গিয়ে হাতজোড় করে সন্মান দেখানোর প্রয়োজন নেই?
লিখলে এমন অনেক ঘটনাই লেখা যায়। তবে এ কথাও সত্য একটা গোটা প্রজন্মকে অনৈতিক বানানো সম্ভবপর নয়। একটি অংশ যেমন নৈতিক শিক্ষা বিনাশকারীতে পরিণত হবে তেমনই একটি অংশ সেই শিক্ষার মর্যাদা অক্ষুন্ন রাখবে। কারণ ইতিহাস সে কথাই বলে। পৃথিবীর ইতিহাসে যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে, সমাজ পরিবর্তনের বিপ্লবে তরুণ প্রজন্ম সর্বদা সচেতনতার বিকাশে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছে। তা সে ফ্যাসিস্ট জার্মানিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের লুকিয়ে ম্যানিফেস্টো প্রচার হোক বা ভারতের ক্ষুদিরাম বসু থেকে ভগৎ সিং। এই প্রজন্মেও সেই অংশ চোখ মেলে তাকাচ্ছে, সংখ্যায় তুলনামূলক কম হওয়ায় সামান্য দেরী হয়ত হবে কিন্তু সংখ্যা বৃদ্ধিও হবে এবং তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি লক্ষ্যভেদে ভ্রান্ত হবে না।

পড়লাম। আমার ভাল লেগেছে। যথেষ্ট প্রয়োজনীয় ও সময় উপযোগী লেখা। এটা সত্যি কথা এখনকার একটা বড় অংশের ছেলে মেয়েরা তলিয়ে দেখতে চায় না। এটা বোধহয় শুধুই তাদের দোষ নয়। এর মধ্যে পাল্টিয়ে যাওয়া সমাজ ব্যবস্থার অবদান অনেকটাই। একটা ছোট বাচ্চা যখন দেখে তার বাড়িতে কি আলোচনা হচ্ছে, কাকে নিয়ে আলোচনা হচ্ছে তখন তার মনেও একটা ছাপ তৈরী হয়। পরে সেই ছাপ ই তার মতামত হয়ে বেরিয়ে আসে। তাই বর্তমানের যে রাজনৈতিক ব্যবস্থা তা শুধুমাত্র তাদের রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে নয় মানুষের উদাসীনতার কারণেই চলছে।
ReplyDeleteঠিকই বলেছেন।
Delete