নারী দিবস: শ্রম, নারী ও আন্তর্জাতিকতাবাদ

 --অহিন্দ্রী


আজ আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালনে অনেকেই তৎপর, সকাল সকাল নারী দিবসের পোস্ট বানিয়ে ফেসবুক টেসবুকে ছড়িয়ে দিতে। তবে এই আন্তর্জাতিক নারী দিবস আদতে আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী নারীদের দিবস তা অনেকেই খোঁজ রাখেন না। 



যেসব দিদি বা বোনেরা মডারেট গোছের, রাজনীতি, আন্দোলন যাদের "চিপ" লাগে তারাও নানা উপন্যাস লিখবে ও শেয়ার করবে। তা ভালো করুন,ভাবছেন তো রাজনীতি আর আন্দোলন এর সাথে কী সম্পর্ক? রয়েছে, সম্পর্ক রয়েছে। 


মানব বিকাশের এক্কেবারে শুরুর দিক থেকেই লক্ষ্য করা যায় লিঙ্গের ভিত্তিতে শ্রমের বিভাগ, এবং মহিলাদের কর্মক্ষেত্র হয়ে ওঠে ঘরের সীমানা। কয়েক লক্ষ বছর আগে সমাজ বিকাশের ধাপে পরিবেশের নিরিখে প্রয়োজনীয় স্বাঙ্গীকরণ ছিল এটা। আদিম ইতিহাসকে পিছনে ফেলে দ্রুত গতিতে এগিয়ে এলে দেখা যায় পরবর্তী ধাপগুলোতে নারীদের কাজের সীমানা প্রসারিত হয়েছে এবং একইসাথে বিকশিত হয়েছে পুরুষ আর নারীর জীবনযাত্রা, দায়িত্ব, অবদান এবং সর্বোপরি পরিচয়ের ফারাক। মানবসমাজ সম্পর্কিত যাবতীয়  দিকগুলির অনুরুপ এই ফারাক তৈরিতেও সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হল অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ। এই ফারাক গুণগত ভাবে অন্যতম পর্যায়ে পৌঁছোয় পুঁজিবাদের হাত ধরে এবং একটা সময় পর নারীদের মধ্যে জাগিয়ে তোলে পরিচয়ের জন্য লড়াই। এর পিছনে রয়েছে দীর্ঘ আন্দোলনের মাইলস্টোন। ইতিহাসকে অবজ্ঞা করে কোনো কিছু নিয়ে লাফালাফি করলে বিষয়টার মোটিভ আর গুরুত্ব চেঞ্জ হয়ে যায়। তাই আসুন অল্প অল্প করে ধাপগুলো সাজিয়ে দেখি। 


পুঁজিবাদী আমেরিকায় ১৮৪৮ থেকেই শুরু হয় মহিলাদের অধিকার আদায়ের লড়াই যা পরবর্তীতে ইনধন যোগায় ১৯০৮ এর শ্রমজীবী মহিলাদের আন্দোলনে। ১৯০০ সালে আমেরিকায় ইন্টারন্যাশনাল লেডিস গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন নামে এক ইউনিয়ন খোলে যার উদ্দেশ্য ছিল কর্ম সংস্থান গুলোয় মহিলা কর্মীদের অধিকারগুলোর জন্য লড়াই করা। ১৯০৮ সালে এই ওরগানাইজেশনের প্রভাবে যে আন্দোলন শুরু হয় যা এই আন্তর্জাতিক নারী দিবসের কার্যত স্রষ্টা। 




এই কর্মীদের দাবি কী ছিল?

১.কাজের সময় কমানো (অমানুষের মতো খাটানো হত ১৮ ঘন্টা)

২.বেতন বৃদ্ধি (পুরুষ-মহিলার অসম বন্টন ছিল এবং খুব কম বেতন দেওয়া হত) 

৩. মহিলাদের ভোটাধিকার


এখন দেখবার বিষয় প্রথম দুটো দাবী নিয়ে আমরা আজও লড়াই করছি।  কর্ম সময়ের দীর্ঘতা কমানোর জন্য বা শ্রমিকের বেতন বৃদ্ধি নিয়ে আজও লড়াই চলছে আমাদের। এবং সেই আন্দোলনে স্ট্রাইকও হয়,কিন্তু তখন কিছু মানুষের মনে হয় "কী দরকার এসব স্ট্রাইক করে কর্ম দিবস নষ্ট করার? আমরা ব্যস্ত মানুষ, অসুবিধা সৃষ্টির?"


যদি সেইদিন এই স্ট্রাইকাররা এইসব কথা শুনে চুপ করে যেতেন তাহলে আজ গর্বের সাথে নারী দিবস পালন করতে পারতেন? তাই স্ট্রাইক করে কী হয়, কেন আন্দোলন হয় তা জানতে একটু ইতিহাস ঘাঁটুন দিদিরা। 


নারী দিবসটা শুধু নারী হয়ে জন্মানোর জন্য কেউ এসে পুরস্কার হিসেবে দিয়ে যায়নি, একজন নারী এবং শ্রমিক হওয়ার দায়ে যে শোষণ তার বিরুদ্ধে  অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে আদায় করতে হয়েছে আন্দোলনের মাধ্যমে। আর যারা সদর্পে বলেন "ভোট দিইনা", তারা জেনে রাখুন আন্দোলনটা ভোটাধিকার আদায়ের জন্যও হয়েছিল।


ফিরে আসি, এরপরও চলতে থাকে নানা দেশে বিশ্বজুড়ে নারী আন্দোলন, রাশিয়ায় ফেব্রুয়ারি বিপ্লব যা অন্যরকম তরঙ্গের জোগান দেয় ওয়ার্কিং ওম্যানদের প্রতিবাদে সামিল হতে। এই আন্দোলন যে ধীরে ধীরে বিপ্লবে পরিণত হচ্ছে তা বুঝেই ১৯১৭ সালের রাশিয়ার সরকার তাদের দাবী দাওয়া মানতে বাধ্য হয়, শির নত করে। ভোটাধিকার দিতেও বাধ্য হয়। রাশিয়ার এই আন্দোলন শুরু হয় ২৩ ফেব্রুয়ারি রাশিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী যা গ্রেগোরিয়ান ক্যালেন্ডার মানে আমরা ইন্টারন্যাশানালি যে ক্যালেন্ডার মানি তা অনুযায়ী ছিল ৮ ই মার্চ। ১৯৭৫ এ রাষ্ট্রসংঘ অফিশিয়ালি এই দিনটিকে ডিক্লেয়ার করে আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী নারী দিবস হিসেবে।


 যদিও  আমেরিকান গার্মেন্টস ওয়ার্কার মহিলাদের স্ট্রাইকের পর এই আন্দোনের প্রতীক হিসেবে আমেরিকান সোশ্যালিস্ট পার্টি আমেরিকান নারী দিবস হিসেবে উদযাপন করেছিল ১৯০৯ সালে, তবে তার কোনো নির্দিষ্ট তারিখ ছিল না। এবং আন্তর্জাতিক ভাবে অফিশিয়ালি স্বীকৃতও ছিলনা। 


এইছিল আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী নারী দিবস, এই দিনটার আন্দোলনগুলো যেরকম লিঙ্গভিত্তিক ভেদাভেদের বিরুদ্ধে ছিল তেমনই ছিল ক্যাপিটালিস্ট সরকারগুলোর শ্রমজীবীর পেট মারার পলিসির বিরুদ্ধে। এই সংগ্রাম ছিল শ্রেণী সংগ্রাম। পুঁজিবাদী ব্যবস্থা অত্যন্ত চতুর, এবং খুব সুকৌশলে যেকোনো জায়গা থেকে শ্রেণী সংগ্রামের ইতিহাসকে মুছে ফেলতে চায়। সেই কৌশলেরই পরিণতি হিসাবে আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী নারী দিবসের রুপান্তর ঘটেছে আন্তর্জাতিক নারী দিবসে, শ্রেণী শোষণ ভুলিয়ে এক সংকীর্ণ পরিচয়ের রাজনীতিতে উৎসাহ দেওয়ার উদ্দেশ্যে। 

কিন্তু ভোলানো এখনও সম্ভব হয়নি এবং এই সংগ্রাম আমাদের শেখায় আমরা নিরপেক্ষ নই, পক্ষ নিতেই হবে এবং অধিকারটা ছিনিয়ে আনতে আন্দোলন করতে হবে। মার্ক্স সেই কবেই বলে গেছেন, সর্বহারার হারানোর শুধু শৃঙ্খলটুকু আছে কিন্তু জেতার জন্য পড়ে আছে গোটা বিশ্বই।

শ্রমজীবী মানুষের ঐক্য জিন্দাবাদ!

বিপ্লব দীর্ঘজীবি হোক!


                                       

Comments

Popular posts from this blog

From a damn HINDU DEVOTEE to an ATHEIST

কৃষ্ণচূড়া গাছ